বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৭ পূর্বাহ্ন
ঘুষ, সিন্ডিকেট বাণিজ্য, ক্ষমতা দাপানো এবং নৈতিক অবক্ষয়ের একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগে তোলপাড় শুরু হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরে। এবার আলোচনার কেন্দ্রে চট্টগ্রাম ও ঢাকার সাভার সার্কেলের বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সম্প্রতি তাকে ওএসডি (OSD) করা হলেও সামনে আসছে তার বিপুল পরিমাণ অনিয়ম, জালিয়াতি এবং স্বজনপ্রীতি নির্ভর দুর্নীতির চিত্র। শুধু পেশাগত ক্ষেত্রই নয়, তার চরম ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক প্রতারণার তথ্য উন্মোচন করেছেন তার নিজ স্ত্রী।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ অবস্থানকালেই বিধি-বহির্ভূতভাবে বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন দিয়ে অন্তত ২ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেন বদরুল। পরবর্তীতে অবৈধ অর্থের জোরে বাগিয়ে নেন চট্টগ্রাম ১ নম্বর গণপূর্ত সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদ। সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে লোপাট করেন আরও কয়েক কোটি টাকা।
এরপর কুমিল্লা সার্কেলে সংক্ষিপ্ত মেয়াদে অবস্থানকালেও চলে তার ব্যাপক লুটপাট। ২০২৪ সালে তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরীর সময়ে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলে পদায়নের জন্য মন্ত্রীর রাজনৈতিক এপিএস মুসা আনসারীকে কোটি টাকার ঘুষ দেন বলে অভিযোগ ওঠে। মন্ত্রীর চাপের মুখে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার তাকে ঢাকার ভালো কোনো সার্কেলে পদায়নের আশ্বাস দিতে বাধ্য হন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলালেও বদরুলের দাপট থামেনি। পদায়ন পেতে ব্যর্থ হয়ে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে লাথি মারাসহ চরম অশালীন আচরণ করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে পরিস্থিতির চাপে পড়ে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী তাকে সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সার্কেলেই পদায়ন করতে বাধ্য হন।
সাভার সার্কেলে যোগ দেওয়ার পর নিয়ম-নীতির চরম তোয়াক্কা না করে বাণিজ্য শুরু করেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল শতকরা ৮০ ভাগ কাজ এলটিএম (LTM) এবং ২০ ভাগ কাজ ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করার। কিন্তু বদরুল ১৫% সরাসরি পার্সেন্টেজের বিনিময়ে শতকরা ৮০ ভাগ কাজই ওটিএম পদ্ধতিতে নিজস্ব ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করে দেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বদরুল আলম খান ও তার ঘনিষ্ট ‘আসিফ’ নামের এক ঠিকাদারের গোপন পার্টনারশিপ রয়েছে। আসিফকে দিয়ে তিনি মিরপুর ডিভিশনের ভাষানটেক থানাসহ সাভার, মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরের একাধিক প্রজেক্ট পাইয়ে দেন।
বদরুলের এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটে আরও রয়েছেন কথিত প্রফেসর মনির, ভোলার পলাশ, হাসান এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সোহরাব। গত দেড় বছরে সাভার সার্কেলের ৪টি ডিভিশনে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাজ বিতরণ করা হয়েছে।
শুধু পেশাগত জায়গায় দুর্নীতিই নয়, বদরুল আলম খানের বিরুদ্ধে উঠেছে চরম নৈতিক অবক্ষয় ও একাধিক অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ। সম্প্রতি তার স্ত্রী গণমাধ্যমে এক সাক্ষাৎকার দিয়ে স্বামী বদরুল আলমের অন্ধকার জীবনের চিত্র তুলে ধরেন।
সাক্ষাৎকারে তার স্ত্রী (যিনি পেশায় একজন শিক্ষক) জানান: “৫ই আগস্টের পর সে যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেছে। বাসা, অ্যাপার্টমেন্ট, গাজীপুরের ফ্যাক্টরি, ডেভেলপার ব্যবসা—সব সম্পত্তি সে তার ভাই-বোনদের নামে লিখে দিয়েছে। নিজের, আমার বা সন্তানদের নামে কিছুই রাখেনি।
আমি একজন শিক্ষক হিসেবে কখনোই তার অবৈধ আয় সমর্থন করিনি। বাইরে থেকে অবৈধ উপহার আনলেও আমি ঘরে ঢুকতে দিতাম না। তাই সে সব টাকা ভাই-বোনদের পেছনে উড়িয়েছে।
স্ত্রী আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করে বলেন, *”সে গোপনে আরেকটি বিয়ে করেছে এবং আরও অনেক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে, যার প্রমাণ ও ভিডিও আমার কাছে আছে।
রোজার ঈদের পর থেকে সে আমাদের সাথে অপরিচিত মানুষের মতো ব্যবহার শুরু করে এবং মানসিক নির্যাতন চালায়। এখন সে আমাকে ডিভোর্স নোটিশ পাঠিয়েছে। যে মানুষটা নিজের সন্তানদের কথা ভাবল না, তার এই মুখোশ মানুষের সামনে খুলে যাওয়া উচিত।”
উত্থাপিত অভিযোগ ও স্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বক্তব্য জানতে প্রকৌশলী বদরুল আলম খানের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।