শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:২২ পূর্বাহ্ন
বিশেষ প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবার মান বাড়াতে বেসরকারি খাতে ক্যাটারিং ও অন-বোর্ড সার্ভিস দেওয়া হলেও, কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। এর মধ্যে অন্যতম—রেল মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘কালনী এক্সপ্রেস’ ট্রেনে খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান **‘সুরুচি ফাস্টফুড অ্যান্ড ক্যাটারারস’**।
অভিযোগ উঠেছে, সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠানটির মালিক আব্দুর রাজ্জাক ও তার সিন্ডিকেট ট্রেনের ভেতরেই গড়ে তুলেছে এক বিশাল টিকিট কালোবাজারি ও চাঁদাবাজির চক্র।
ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া রুটে চলাচলকারী এই ট্রেনে খাবার বিক্রির আড়ালে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
খাবারের আড়ালে টিকিটের বাণিজ্য: ক্যামেরায় ধরা পড়ল অবৈধ লেনদেন:
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ক্যাটারিং সার্ভিসের কর্মীদের কাজ যাত্রীদের খাবার সরবরাহ করা। কিন্তু কালনী এক্সপ্রেসে ঘটছে সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা। ‘আড়ালের চোখ’ অনুসন্ধানী টিমের ক্যামেরায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু দৃশ্য। সুরুচি ফাস্টফুডের স্টাফ সাইদুরকে দেখা গেছে ট্রেনের ভেতরেই সরাসরি যাত্রীদের টিকিট দেওয়ার নামে অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নিতে। ঢাকা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী তিন যাত্রীর কাছ থেকে টিকিট ও ‘টিটিই ম্যানেজ’ করে দেওয়ার কথা বলে জনপ্রতি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত পকেটে পুরেছেন তিনি।
প্রশ্ন উঠেছে, একজন ক্যাটারিং কর্মীর হাতে ট্রেনের টিকিট কীভাবে আসে এবং কোন ক্ষমতার জোরে তারা রেলের চেকার বা টিটিই (TTE) ম্যানেজ করার নামে এই বাণিজ্য চালাচ্ছেন?
অতিরিক্ত বগিতে আসন বাণিজ্য ও ডিজিটাল কারসাজি:
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চক্রের জাল বেশ গভীরে ছড়ানো। কালনী এক্সপ্রেসের অতিরিক্ত বগির দায়িত্বে থাকা এটেন্ডেন্ট হারুন আহমেদের বিরুদ্ধে টিকিট ছাড়া যাত্রী ওঠানোর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। অতিরিক্ত টিকিটের বিনিময়ে বগিতে ৮ থেকে ১০ জন অবৈধ যাত্রী তোলার বিষয়টি অনুসন্ধানী টিমের কাছে স্বীকার করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, এই এটেন্ডেন্টদের স্মার্টফোনে সবসময়ই অগ্রিম ৪-৫টি টিকিট বুক করা থাকে, যা কালোবাজারির উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।
হারুন ছাড়াও এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সক্রিয় সদস্য মুন্না, সাইদুর ও শাহীনসহ প্রায় সব এটেন্ডেন্ট। ট্রেনের ভেতরে চলা এই বিশাল অঙ্কের ‘পার্সেন্টেজ’ বা কমিশনের টাকা কার পকেটে যাচ্ছে? ক্যাটারিং কোম্পানির মালিক আব্দুর রাজ্জাক কি নিজেই এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন, এমন প্রশ্ন এখন সর্বত্র।
চাকরি বাণিজ্য ও ‘লাইন খরচ’ এর নামে চাঁদাবাজি:
অভিযোগের তীর সুরুচি ফাস্টফুডের ম্যানেজার খাইরুল ইসলাম আকাশের দিকেও। জানা গেছে, স্টুওয়ার্ড ও স্টাফদের নিয়োগ দেওয়ার নাম করে একেকজন প্রার্থীর কাছ থেকে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করেছে এই রাজ্জাক-আকাশ সিন্ডিকেট। আর এই অগ্রিম দেওয়া টাকার উসুল করতে ট্রেনের ভেতরে যাত্রীদের জিম্মি করে ‘লাইন খরচ’ নামের এক অভিনব চাঁদাবাজি চালাচ্ছে স্টাফরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে—**‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’**। কিন্তু কালনী এক্সপ্রেসে এই নিয়মের কোনো বালাই নেই। বরং ভুয়া বা অন্যের নামে কাটা টিকিটের মাধ্যমে যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত অবৈধ অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
তথ্য গোপনের চেষ্টা ও সচেতন মহলের দাবি:
এই দুর্নীতির খবর যাতে গণমাধ্যমে প্রকাশ না পায়, সেজন্য অনুসন্ধানী টিমকে একাধিকবার ‘ম্যানেজ’ বা আপস করার চেষ্টা করেছেন ম্যানেজার আকাশ। তবে সাধারণ যাত্রী এবং রেলের মাঠ পর্যায়ের সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে এই চক্রের অপকর্মে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
রেলওয়ের মতো একটি রাষ্ট্রীয় সেবামূলক খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন লাগামহীন দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সচেতন মহল। সাধারণ মানুষের দাবি, এই চক্রের মূল হোতা আব্দুর রাজ্জাক, ম্যানেজার আকাশসহ পুরো সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করুক বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
*(অনুসন্ধানের ১ম পর্ব)*